অশান্তির নগরীতে পরিণত হয়েছে খুলনা। প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে হত্যাকাণ্ড। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে নগরবাসী। ৯৫ শতাংশ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে মাদক কেন্দ্রিক। আর পাঁচ শতাংশ অন্যান্য কারণে বলে পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে। সমাজ থেকে সকল প্রকার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নির্মূলে নাগরিক সমাজকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
চলতি বছরের শুরু থেকে ১৯ আগস্ট পর্যন্ত খুলনা মহানগরীতে ২২টি হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছে। আধিপত্য বিস্তার ও মাদক কারবারির কর্তৃত্ব নিয়ে অধিকাংশ হত্যা সংগঠিত হয়েছে।
একাধিক গোয়েন্দা সূত্র জানায়, বিগত সরকার আমলে মাদক বিক্রি হতো রাজনৈতিকে ইশারা ইঙ্গিতে। ক্ষমতার পালা বদলে মাদক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে পাড়া মহল্লায় বেড়েছে বিরোধ। আর সেই বিরোধ থেকে ঘটছে খুন-খারাবি। দেখা দিচ্ছে আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি।
এই পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা এখন পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব নয় বলে দাবি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সংস্থার। তবে একাধীক সূত্রের অভিযোগ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারি কমে যাওয়া, পুলিশের থানা কেন্দ্রিক অফিস ওয়ার্কের বাইরে দায়িত্ব পালনে কঠোর না হওয়া এবং অপরাধীদের সাথে দুর্নীতিবাজ পুলিশের সখ্যতা থাকায় অপরাধ প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে।
খুলনা জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, ৫ আগস্টের পর থেকে আমাদের অধিনস্ত কর্মকর্তা যারা আছেন তারা প্রফেশনালী কাজ করছে না। তাদের ভেতরে এক ধরনের দ্বিধা কাজ করছে। আগে যে উদ্যোম নিয়ে কাজ করত সেটা তাদের ভেতর নেই। ৫ আগস্টের পর পুলিশ যে ধাক্কা খেয়েছে সেটা এখনও সামলাতে পারেনি তারা। দ্বিতীয়টি হলো আইনকে মানুষের শ্রদ্ধা করা উচিত। সেটা মানুষের মধ্য থেকে উঠে গেছে। মানুষ যদি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয় তাহলে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার উন্নতি হবে। তিনি আরও বলেন, সব ঘটনায় শুধু পুলিশকে দায়ী করলে হবে না। সমাজ ব্যবস্থার উন্নতির দায়িত্ব আমাদের সকলের। মাদক কার্যক্রম দমনে সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের তিনি এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি চরমপন্থিরা মাথা চড়া দিয়ে উঠেছে। তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কেএমপি ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (সদর) এমএম শাকিলুজ্জামান বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে অসফল আমরা বলবনা। পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যাবে। আমাদের কার্যক্রম থেমে নেই। অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার হচ্ছে। আসামিও ধরা পড়ছে। হরিণটানা এলাকার দু’খুনে ঘটনায় সন্দেহের তালিকায় সাইফির নাম আসছে। তাকেও এর আগে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। কিন্তু সম্প্রতি হাইকোর্ট থেকে জামিনে বের হয়েছে সে। আমরা কাউকে দোষারোপ করছি না আমরা আমাদের কাজ করে যাচ্ছি।
শহরে হত্যাকাণ্ড বাড়ছে হচ্ছে কেন এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, স্বার্থগত দ্বন্দ্ব ও মাদকের কারণে হত্যাকাণ্ড হচ্ছে। মানুষের কাউন্সিলের জন্য উঠান বৈঠক ও অন্যান্য কাজ করা হচ্ছে। অপরাধ প্রবণতা কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান তিনি।
নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব বাবুল হাওলাদার বলেন, খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যে কোনো সময়ের রেকর্ডকে ভঙ্গ করেছে। পুলিশ প্রশাসনের যতগুলো শাখা মাঠে রয়েছে তারা সম্পূর্ণ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। আমাদের প্রশ্ন প্রশাসনের আন্তরিকতার ঘাটতি রয়েছে না-কি পেশাদারিত্বের ঘাটতি রয়েছে, না-কি প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে। না-কি শস্যের মধ্যে ভূত রয়েছে জানি না। ঘর থেকে মসজিদ পর্যন্ত কোথাও নিরাপদ নেই। যখন তখন খুনের ঘটনা ঘটছে। তিনি আরও বলেন, মাদকের সাথে যারা জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে পারলে এ সমস্যার সমাধান হতে পারে।
খুলনা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মোঃ তরিকুল ইসলাম বলেন, খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সর্বকালের সবচেয়ে নিম্ন পর্যায়ে অবস্থান করছে। অন্তঃকোন্দলের কারণে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটছে। এর মূল উৎস মাদক। মাদক সিন্ডিকেট একে অপরকে কীভাবে ঘায়েল করে আধিপত্য বিস্তারে ব্যস্ত রয়েছে। সমাজকে মাদকমুক্ত করতে পারলে অপরাধ প্রবণতা হ্রাস পাবে। তবে এর জন্য দরকার সমন্বিত প্রচেষ্টা। বিশেষ করে রাজনৈতিক সদিচ্ছা। নাগরিক নেতাদের কথা বলার সময় এসেছে। ঘরে ঘরে হত্যাকাণ্ড না দেখতে চাইলে সবাইকে মাঠে নামতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কঠোর হতে হবে। তাদের অনেকেই মাদকের সাথে সংশ্লিষ্ট রয়েছে। এটি একাধিকবার প্রমাণিত হয়েছে। যে কারণে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটছে।
২৪ নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর শমসের আলী মিন্টু বলেন, নগরবাসী নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। প্রশাসনের দায়িত্ব মানুষের নিরাপত্তা বিধান করা। মাদকের আধিপত্যের কারণে প্রতিনিয়ত খুনের ঘটনার দায় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এড়াতে পারে না।
কেসিসি প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, বিভিন্ন পাড়া মহল্লায় সন্ত্রাস বিরোধী মিটিং করা হচ্ছে। খুব তাড়াতাড়ি এ পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ করা হবে। গত কয়েকদিনে ঘটনায় উদ্বিগ্ন জনগণ। বিশেষ করে বুধবারের দুইটি হত্যাকাণ্ডে ঘটনায় নগরবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। প্রশাসনকে বলা হয়েছে বিভিন্ন ওয়ার্ডে ও সন্ত্রাসপ্রবণ এলাকায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। প্রশাসন সেভাবে কাজ করছে। সন্ত্রাস দমানোর জন্য সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে প্রশাসনকে সহায়তা করা হবে।
খুলনা গেজেট/এনএম

